আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের উদারতা যে কারণে নিষ্ফল হয়েছে, আপনি কি তা জানতে চান? আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআনের উদারতা যে কারণে নিষ্ফলতা জানার আগে জানতে হবে আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন ছিলেন মক্কার এক কিংবদন্তি দানবীর, যিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে কখনো পিছপা হননি।
দুর্ভিক্ষ কিংবা দুর্দিন। যে কোনো পরিস্থিতিতে তিনি নিজের বিশাল সম্পদ বিলিয়ে দিতেন মানুষকে খাদ্য, আশ্রয় ও সেবা দিতে। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা ও মানবিকতার চর্চায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এত বড় উদারতা সত্ত্বেও তার এই সব সৎকর্ম পরকালের জন্য কোনো ফল বয়ে আনবে না।
কারণ, তার হৃদয়ে ছিল না ঈমানের আলো, ছিল না আল্লাহর প্রতি বিনয় ও আত্মসমর্পণ। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নয়, বরং খ্যাতি ও সামাজিক মর্যাদাই ছিল তার কর্মের পেছনের প্রেরণা। তাই তার দান ও মহত্ব আখিরাতে কবুল হয়নি। এই ঘটনাটি মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা মানবসেবার সাথে সাথে ঈমান ও আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণই চূড়ান্ত সফলতার চাবিকাঠি।
নিঃস্ব অবস্থায় জীবন শুরু করে দানশীলতার শীর্ষে পৌঁছানো একজন মানুষ ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে জুদআন ইবনে কাব। দুঃসময়ে মানুষ যখন মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখনও তিনি গরিব দুঃখীদের আহ্বান করে নিজ হাতে আহার দিতেন। আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করতেন সর্বোচ্চ মর্যাদায়। এতসব মহৎ গুণ থাকা সত্ত্বেও কোরআন-হাদিসের আলোকে জানা যায়, আল্লাহর কাছে এসব কাজ গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ, তিনি কখনো তার প্রভুর সামনে নিজেকে সঁপে দেননি, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেননি, ঈমান আনেননি।
তিনি ছিলেন হজরত আবু বকর (রা.) এর চাচা এবং হজরত আয়েশা (রা.) এর দাদা। জাহেলিয়াতের সেই অন্ধকার সময়ে, যখন মানুষ ক্ষমতা ও স্বার্থে অন্ধ হয়ে পড়েছিল। তখন আব্দুল্লাহ ছিলেন অতিথিপরায়ণতায় অগ্রগামী। অথচ তার জীবনের শুরুটা ছিল ভিন্ন। অভাব অনটন আর দুর্ব্যবহারের কারণে সমাজ তাকে করুণ দৃষ্টিতে দেখতো। পরবর্তীতে ভাগ্য বদলে গেলে এক অদ্ভুত ঘটনার মধ্য দিয়ে তিনি বিপুল ধন সম্পদের মালিক হন।
একদিন সমাজের অবহেলা থেকে মুক্তি পেতে তিনি পাহাড়ের চূড়ায় চলে যান, আত্মবিনাশের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করেন এক গোপন গুহা, যেখানে ধন সম্পদ, রত্নভাণ্ডার এবং বিখ্যাত শাসকদের সমাধিস্থল ছিল। সেই গুহা থেকে সম্পদ নিয়ে ফিরে এসে তিনি সমাজের প্রতি দান করতে শুরু করেন। বারবার সেই গুহায় গিয়ে সম্পদ এনে তিনি দুঃখীদের মুখে হাসি ফোটাতেন। বিশাল পাতিল বসিয়ে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে খাবার দিতেন। এমনকি সেই পাতিল এত বড় ছিল যে উটে চড়ে বা সিঁড়ি বেয়ে তাতে পৌঁছাতে হতো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ও শৈশবে সেই পাতিলের ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন বলে হাদিসে এসেছে। তবুও, এতো সব মানবিক কাজ, দান ও উদারতা শেষপর্যন্ত কোনো কাজে এলো না। কারণ তিনি আল্লাহর সামনে কখনো মাথা নত করেননি। তার হৃদয় ছিল ঈমানহীন। হজরত আয়েশা (রা.) এর প্রশ্নের উত্তরে নবিজী (সা.) স্পষ্ট করে বলেন, তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়নি, ঈমান আনেনি। তাই তার ভালো কাজ পরকালে কোনো উপকারে আসবে না।
এই ঘটনা আজকের মুসলিম উম্মাহর জন্য এক জ্বলন্ত শিক্ষা। মানবতা, দানশীলতা, আত্মীয়তার সম্পর্ক এসব নিঃসন্দেহে মহৎ কাজ। কিন্তু এগুলোর ভিত্তি হতে হবে ঈমানের উপর। পরকালীন সফলতা কেবল তখনই অর্জিত হবে। যখন আমাদের অন্তরে থাকবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভালো কাজের পেছনে থাকবে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের নিয়ত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে ঈমানসহকারে জীবনযাপন এবং দান সদকা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও মানবসেবার মাধ্যমে পরকালীন মুক্তির পথ সুগম করার তাওফিক দিন। আমিন।