আমাদের মধ্যে অধিকাংশই বয়সকে পাশ কাটিয়ে যৌবন ধরে রাখতে চাই। কিন্তু সেটা তো বাস্তবে সম্ভব হয় না। প্রকৃতির নিয়মেই বয়স বাড়ে আমাদের। শরীরের অঙ্গগুলি এগিয়ে যায় বার্ধক্যের দিকে। যদিও বিশ্বের কিছু গবেষক আবার এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
তাঁদের মতে, গোটা শরীরের বয়স বাড়লেও ব্যতিক্রম হল লিভার। এটি নিজের যৌবন ধরে রাখতে পারে। এর বায়োলজিক্যাল এজ থাকে ৩ বছরের নীচে। অর্থাৎ আপনার বয়স ২০, ৩০, ৫০, ৬০, ৭০ যাই হোক না কেন লিভারের বয়স থেকে যায় ৩ বছরের নীচে। আর এই গবেষণা সামনে আসার পরই চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে।
পোস্ট সূচিপত্র
গবেষণা
লিভার
যকৃতের প্রধান কার্যাবলি
লিভারের সমস্যার লক্ষণসমূহ
যকৃত সুস্থ রাখতে করণীয়
কী করেন বিজ্ঞানীরা?
লিভার সুস্থ রাখার সহজ নিয়মগুলো
গবেষণা
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স বাড়লেও মানুষের লিভার তুলনামূলকভাবে তরুণ থাকে। এই চমকপ্রদ গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন জার্মানির টিইউ ড্রেসডেন-এর সেন্টার ফর রিজেনারেটিভ থেরাপিস ড্রেসডেন (CRTD) এর বিজ্ঞানীরা। গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে খ্যাতনামা বৈজ্ঞানিক জার্নাল Cell Systems এ।
এই গবেষণার মাধ্যমে উঠে এসেছে এমন এক তথ্য, যা ভবিষ্যতের পুনর্জীবন থেরাপি (regenerative therapy) ও বয়সভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে নতুন দিশা দেখাতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লিভার কোষের পুনর্জন্মের ক্ষমতা এতটাই উন্নত যে, এটি প্রায় সব বয়সেই নবীন অবস্থা ধরে রাখতে সক্ষম।
লিভার
আমাদের শরীরের এক নিরব রক্ষক মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ লিভার বা যকৃত, যা পেটের উপরের ডানদিকে, পাঁজরের নিচে অবস্থান করে। এটি শরীরের বৃহত্তম গ্রন্থি এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যকৃত প্রোটিন তৈরি, হজমে সহায়তা, রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে।
যকৃতের প্রধান কার্যাবলি
-
পরিপাক প্রক্রিয়ায় ভূমিকাঃ যকৃত পিত্তরস তৈরি করে, যা খাদ্যে থাকা চর্বি হজমে সহায়তা করে।
-
প্রোটিন ও অন্যান্য উপাদান তৈরিঃ এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন, কোলেস্টেরল এবং নানা রাসায়নিক উপাদান প্রস্তুত করে।
-
বিষাক্ত পদার্থ নিষ্কাশনঃ অ্যামোনিয়া ও অন্যান্য বর্জ্য উপাদানকে বিশুদ্ধ করে শরীর থেকে বের করে দেয়।
-
শর্করা নিয়ন্ত্রণঃ অতিরিক্ত গ্লুকোজকে গ্লাইকোজেন হিসেবে সংরক্ষণ করে এবং রক্তে শর্করার প্রয়োজন অনুযায়ী তা সরবরাহ করে।
-
রোগ প্রতিরোধে সহায়তাঃ লিভার শরীরের রোগজীবাণু ধ্বংস করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে।
লিভারের সমস্যার লক্ষণসমূহ
যকৃতের সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ত্বক ও চোখে হলুদাভ ভাব (জন্ডিস), পেটব্যথা বা ফোলাভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি, বমি বা বমি বমি ভাব এবং ত্বকে চুলকানি।
যকৃত সুস্থ রাখতে করণীয়
লিভার সুস্থ রাখতে হলে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়া অত্যন্ত জরুরি। যদি যকৃত সংক্রান্ত কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তবে বিলম্ব না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আমাদের দেহে লিভার এমন একটি অঙ্গ, যা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কাজের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এটি মূলত বাইল বা পিত্তরস তৈরি করে, যা চর্বি হজমে সাহায্য করে। পাশাপাশি শরীর থেকে টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান বের করে দেওয়ার কাজেও এর ভূমিকা অনন্য।
এছাড়া, বিপাকের হার বা মেটাবলিজম নিয়ন্ত্রণেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অঙ্গটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি নিজে থেকেই কোষের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করতে পারে এবং প্রয়োজনে নতুন কোষ তৈরি করে নিতে পারে। এক কথায়, এটি একটি স্ব-পুনর্জন্মশীল (self-regenerating) অঙ্গ। তাই অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় লিভারের বয়স তুলনামূলকভাবে ধীরে বাড়ে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই পুনর্জীবন প্রক্রিয়ায় কিছুটা বাধা আসে, ফলে সামান্য হলেও লিভারও বয়সের ছাপ নিতে শুরু করে।
এই বিষয়টি ঘিরেই সাম্প্রতিক এক গবেষণা পরিচালনা করেন ডাঃ অলাফ বার্গম্যান ও তাঁর গবেষক দল। তিনি বলেন, "কিছু গবেষণা দাবি করেছে যে লিভার কোষ দীর্ঘজীবী, আবার অনেক গবেষণা বলেছে লিভারের কোষগুলো নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। এই দ্বিধা দূর করতে মানুষের লিভার কোষের প্রকৃত বয়স নির্ধারণ করাই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য এবং আমরা তা সফলভাবে করেছি।"
কী করেন বিজ্ঞানীরা?
লিভারের বয়স নির্ধারণের জন্য একটি বহুবিদ্যাশাখার গবেষকদল গঠন করা হয়, যাতে ছিলেন জীববিজ্ঞানী, গণিতবিদ, পদার্থবিদ এবং চিকিৎসকরা। তাঁরা ২০ থেকে ৮৪ বছর বয়সের মধ্যে কিছু মৃত ব্যক্তির লিভার নমুনা বিশ্লেষণ করেন। গবেষণায় দেখা যায়, ব্যক্তির প্রকৃত বয়স যতই হোক না কেন, তাঁদের লিভারের বয়স প্রায় একইরকম থাকে। গবেষণার প্রধান ডাঃ অলাফ বার্গম্যান বলেন, “২০ হোক বা ৮৪ বয়স যাই হোক না কেন, মানুষের লিভারের গড় বয়স প্রায় তিন বছরেরও কম।”
এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে অভাবনীয়, তবে এটিকে জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকলে চলবে না। কারণ, লিভারের এই স্বাভাবিক পুনর্জন্ম ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সঠিক জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাস। নিচে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেওয়া হলো। যা মেনে চললে লিভার সুস্থ রাখা সম্ভবঃ
লিভার সুস্থ রাখার সহজ নিয়মগুলো
১. ফাস্ট ফুড ও আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার এড়িয়ে চলুন।
২. চিনি, মিষ্টান্ন ও আইসক্রিম থেকে বিরত থাকুন।
৩. মদ্যপান সম্পূর্ণভাবে পরিহার করুন।
৪. প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফল খাওয়ার চেষ্টা করুন।
৫. পরিমিত জল পান করুন, যা লিভার পরিষ্কার রাখতে সহায়ক।