আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা নিষেধ প্রত্যেক মুসলমানের জানা দরকার। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা নিষেধ সম্পর্কে আল্লাহর অসীম রহমত থেকে কোনো মানুষকে হতাশ করে দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অনুচিত ও নিষিদ্ধ। কারণ, তিনি হলেন পরম দয়ালু, অশেষ করুণার মালিক।
এমন কোনো গোনাহ নেই যা তিনি ক্ষমা করতে অক্ষম, যদি বান্দা খাঁটি মনে তাওবা করে তাঁর দিকে ফিরে আসে। একজন সত্যিকারের মুমিন সবসময় আল্লাহর দয়ার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে এবং অন্যকেও সেই আশার আলো দেখাতে চেষ্টা করে। আজকের আর্টিকেল এ জানবো আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা নিষেধ সম্পর্কে।
আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করা নিষেধ
দুনিয়ার এই জীবন মূলত একটি পরীক্ষা-ভরা সফর, যেখানে প্রতিটি মানুষকে বিচরণ করতে হয় আল্লাহর নির্ধারিত সীমা ও বিধান মেনে। এই পথচলায় মানুষের দায়িত্ব হচ্ছে নিজে সঠিক পথে চলা এবং অন্যকে সেই হেদায়াতের পথে আহ্বান জানানো। তবে কার পরিণতি হবে জান্নাতে আর কার হবে জাহান্নামে এই চূড়ান্ত ফয়সালা মানুষের হাতে নয়। একমাত্র মহান আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। কারণ মানুষ বাহ্যিকভাবে ধার্মিক বা পাপী দেখালেও, তার হৃদয়ের অবস্থা, নিয়ত ও আল্লাহর নিকট তার প্রকৃত মর্যাদা কেমন তা একমাত্র তিনিই জানেন।
তাই কেউ যদি কাউকে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেয় বা তাকে জাহান্নামী বলে ফেলে তবে সেটা শুধু দম্ভ নয়, বরং এক ভয়ংকর সীমালঙ্ঘন। এ বিষয়ে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক শিক্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যা আমাদের সকলের জন্য গভীর আত্মপর্যালোচনার বার্তা বহন করে।আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন "আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না কেবল পথভ্রষ্টরাই।" (সূরা ইউসুফ, ১২:৮৭)। কুরআন এবং সহীহ হাদিসে এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে, যাতে কোনো ব্যক্তি যেন নিজে নিরাশ না হয় এবং অন্যকেও নিরাশ না করে।
হাদিসের বর্ণনা
হজরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি। বনি ইসরাঈলের দুইজন ব্যক্তি ছিলেন, একজন ধার্মিক, ইবাদত পরায়ণ। অপরজন বারবার পাপের পথে ফিরতো। ধার্মিক ব্যক্তি তাকে বারংবার উপদেশ দিতো, সতর্ক করতো, বলতো, "ভাই, পাপ কাজ থেকে বিরত হও" কিন্তু একদিন ধৈর্যচ্যুতি ঘটল তার। পাপীকে দেখে ক্ষোভে বলে ফেললঃ "আল্লাহর কসম! তিনি কখনোই তোমাকে ক্ষমা করবেন না, কিংবা জান্নাতে প্রবেশ করতে দেবেন না"
সময় গড়ালে, উভয়েই মৃত্যুবরণ করল। পাহাড়সম ইবাদতকারী ও পাপের বোঝা বয়ে বেড়ানো ব্যক্তি দুজনকেই ডাকা হলো আল্লাহর দরবারে। মহান প্রভু জিজ্ঞেস করলেন সেই ইবাদতগুজারকেঃ “তুমি কি আমার ইচ্ছা ও ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলে? তুমি কি জান্নাত-জাহান্নামের চাবি নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছিলে? কে তোমাকে অনুমতি দিল আমার পক্ষ থেকে কাউকে হতাশ করতে?” তারপর আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিলেনঃ পাপী সেই বান্দাকে ক্ষমা করে দাও এবং জান্নাতে প্রবেশ করাও।
আর যিনি অহংকার করে আমার দয়ার সীমা নির্ধারণ করতে চেয়েছেন তাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দাও। হাদিসের শেষে আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেনঃ "শুধু একটি উচ্চারণ একটি ভুল কথাই তাকে ধ্বংস করে দিলো। তার ইবাদতের পাহাড়ও তাকে রক্ষা করতে পারল না" (সুনান আবু দাউদ)
শিক্ষণীয় বার্তা
-
অন্যকে নসিহত করা ভালো, কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিচার ঘোষণা করা মহাপাপ।
-
পাপী হলেও, একজন বান্দা যদি তাওবা করে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
-
কারো উপর আল্লাহর দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এ কথা বলার সাহস একমাত্র তারাই করে, যারা নিজেদের ঈমানের নিরাপত্তা নিয়ে ভুল ভেবে বসে।
মূল শিক্ষা
মানুষকে সৎ কাজে আহ্বান করা, ভালো কথায় উৎসাহ দেওয়া এটি একজন মুমিনের অপরিহার্য দায়িত্ব। অন্যকে নসিহত করা মানে তার কল্যাণ কামনা করা, তাকে হিদায়াতের পথে ডেকে আনা। কিন্তু মনে রাখতে হবে। কোনো পাপীকে দেখে হতাশার দৃষ্টি দেওয়া, তার উপর আল্লাহর রহমতকে অস্বীকার করা, কিংবা তার জন্য জান্নাতের দরজা বন্ধ ঘোষণা করে বসা। এটি কেবল ভুল নয়, বরং এক ধরণের সীমালঙ্ঘন। কারণ আল্লাহর ক্ষমতা ও করুণা মানবীয় অনুমান বা বিচার বুদ্ধির ঊর্ধ্বে।
একজন মানুষ যত বড় পাপেই লিপ্ত থাকুক না কেন, যদি সে খাঁটি মনে তাওবা করে, আল্লাহর দিকে ফিরে আসে। তবে মহান আল্লাহ ইচ্ছা করলে তার সব গোনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন। তিনি “গফুরুর রাহীম” তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু। কেউ চাইলেই তাঁর রহমতের দরজা বন্ধ করে দিতে পারে না।
উপসংহার
আমাদের প্রধান দায়িত্ব হলো নিজে আল্লাহর নির্দেশিত সরল পথ অনুসরণ করা এবং অপরকে সেই হিদায়তের পথে আমন্ত্রণ জানানো। কে জান্নাতের অধিকারী হবে আর কে জাহান্নামে যাবে। এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত একমাত্র মহান রবের এখতিয়ারে। তাই কোনো মানুষের পাপ দেখে তাকে তুচ্ছজ্ঞান করা বা ধ্বংসের ফয়সালা দেওয়া নয়, বরং তার হিদায়াতের জন্য দোয়া করা, নসিহতের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। এটাই একজন প্রকৃত মুমিনের দায়িত্ব।
আমরা যেন কখনোই আল্লাহর রহমতের দরজাকে কারো জন্য বন্ধ মনে না করি, বরং আশাবাদী থাকি। এই রহমত আমাদের ও আমাদের চারপাশের সবার জীবনে বরকতের ছায়া দান করবে। হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে নিজের বিধান অনুযায়ী জীবন গড়ার তাওফিক দান করো। আমাদেরকে এমন করে গড়ে তোলো যেন আমরা তোমার দীনকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দিতে পারি সৌন্দর্য, সহমর্মিতা ও সত্যতার সাথে।
আমাদের অন্তরকে অহংকার ও নিরাশার কালিমা থেকে পবিত্র রাখো, আর তোমার আলোকে আমাদের ও পুরো উম্মাহর জীবন আলোকিত করে দাও।
আমিন।