আয়ুর্বেদে বিশ্বাস করা হয়, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনের মাধ্যমে শরীরের তিনটি দোষ আছে। বাত, পিত্ত ও কফ এর মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখলে নানা ধরনের পেটের সমস্যা সহজেই প্রতিরোধ করা যায়। বদহজম বা অম্লতার ক্ষেত্রে মুলত পিত্ত দোষের ভারসাম্যহীনতা একটি প্রধান কারণ।
তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় সহজপাচ্য, শীতল প্রকৃতির খাবার। যেমনঃ দই, শসা, নারকেল পানি, জিরা জল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এছাড়াও, অতিরিক্ত তেল মসলা, ঝাল ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চললে হজম শক্তি উন্নত হয় এবং পেটে অস্বস্তি বা জ্বালাভাব থেকে সহজেই মুক্তি পাওয়া যায়। নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান এবং ধ্যান বা যোগব্যায়াম করাও বদহজম নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর উপায়।
বদহজমের লক্ষণ
বদহজম থেকে সুরক্ষা পেতে হলে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনের ওপর বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সঠিক সময়ে ও পরিমাণমতো খাওয়া, খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খাওয়া এবং অতিরিক্ত তেল-ঝাল বা ভাজাপোড়া খাবার থেকে বিরত থাকাই এর অন্যতম প্রতিরোধমূলক উপায়। পাশাপাশি, মানসিক চাপও বদহজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে, তাই নিয়মিত বিশ্রাম, ধ্যান এবং পর্যাপ্ত ঘুম বদহজম প্রতিরোধে সহায়ক।
আয়ুর্বেদ এবং ঘরোয়া প্রতিকার যেমন জিরার জল, আদা চা বা হালকা গরম পানি পান করাও অনেক ক্ষেত্রে উপশম এনে দিতে পারে। তবে যদি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হয় বা বাড়তে থাকে, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। শরীরের সংকেতকে অবহেলা না করে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়াই সুস্থ থাকার মূল চাবিকাঠি।
বদহজমের জন্য ঘরোয়া প্রতিকার
বদহজমের ঘরোয়া প্রতিকারগুলোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো সহজলভ্য, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং বেশিরভাগ উপাদানই আমাদের ঘরে প্রতিদিনের ব্যবহারে থাকে। যেমন, এক চিমটে জিরা গুঁড়া গরম পানির সঙ্গে খেলে হজমে সহায়তা করে। তেমনি, আদা চা বা কাঁচা আদা চিবিয়ে খাওয়াও পেটের অস্বস্তি দূর করতে কার্যকর। পুদিনা পাতা কিংবা তুলসী পাতার রস বদহজম ও গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। এছাড়া, অল্প পরিমাণে হিং গরম পানির সঙ্গে খেলে গ্যাস্ট্রিকের উপসর্গ কমে।
এসব প্রাকৃতিক উপাদান হজমশক্তি বাড়ায়, পেটের প্রদাহ হ্রাস করে এবং পিত্তের ভারসাম্য রক্ষা করতে সহায়তা করে। তবে ঘরোয়া প্রতিকার ব্যবহারের পরেও যদি উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আদা
যেকোনো ভেষজ উপাদানের মতোই আদাও পরিমিত মাত্রায় গ্রহণ করাই নিরাপদ। বিশেষ করে যাঁরা উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভাবস্থা, বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ গ্রহণ করছেন, তাঁদের জন্য অতিরিক্ত আদা খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিমাত্রায় আদা সেবন এড়িয়ে চলাই উত্তম। স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে সামঞ্জস্য রেখে আদাকে ব্যবহার করলে এটি শুধু হজমে সহায়তা করে না, বরং সামগ্রিকভাবে শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে আদার ব্যবহার আপনাকে এনে দিতে পারে স্বাস্থ্যকর ও আরামদায়ক জীবনযাপন।
পুদিনা
পুদিনা শুধুমাত্র একটি সুগন্ধি ভেষজ পাতা নয়, এটি প্রকৃতির দেওয়া এক অনন্য উপহার যা শরীর ও মনের সতেজতা এনে দিতে পারে। পুদিনা পাতার মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক তেল হজমের সমস্যা দ্রুত উপশম করতে সহায়তা করে, বিশেষ করে পেটের গ্যাস, বদহজম বা অস্বস্তি হলে এটি তাৎক্ষণিক আরাম দিতে পারে। পেপারমিন্ট তেল বা পুদিনা চা শরীরে শীতলতা এনে দেয়, যা গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত তাপজনিত অস্বস্তি কমাতে দারুণ কার্যকর। ঠান্ডা লাগা। মাথাব্যথা কিংবা সাইনাসজনিত সমস্যায় পুদিনার ঘ্রাণও স্বস্তি আনে।
এছাড়া, পুদিনা ত্বকের নানা সমস্যা যেমন চুলকানি বা ব্রণ উপশমেও কার্যকর। রান্নার স্বাদ বৃদ্ধির পাশাপাশি, এটি রূপচর্চা ও স্বাস্থ্য রক্ষায় নিয়মিত ব্যবহার করলে দেহ ও মন উভয়ই থাকে সতেজ ও ফুরফুরে। সোজা কথায়, পুদিনা শুধুই একটি রান্নার উপাদান নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক হেলথ বুস্টার।
ক্যামোমাইল
ক্যামোমাইল প্রকৃতির এক শান্তিদায়ক ভেষজ উপাদান, যা শুধু শরীর নয়, মনকেও প্রশান্ত করে। ছোট ছোট সাদা ফুল এবং মৃদু সুগন্ধযুক্ত এই উদ্ভিদ শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ক্যামোমাইল চা ঘুমের সমস্যা, মানসিক উদ্বেগ ও বদহজমে একটি প্রাকৃতিক প্রতিকার হিসেবে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদান শরীরকে ভেতর থেকে আরাম দেয় এবং প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।
নারীদের মাসিকজনিত ব্যথা হোক কিংবা হালকা পেটের গণ্ডগোল, ক্যামোমাইলের নরম ছোঁয়া এনে দিতে পারে স্বস্তি। শুধু পানীয় হিসেবেই নয়, এটি ত্বকের যত্নেও ব্যবহার করা যায়। ফেসপ্যাক, টোনার বা এমনকি স্নানের জলে ব্যবহার করলেও ত্বকে প্রশান্তি আসে। তবে যেহেতু এটি একটি ভেষজ উপাদান, তাই অ্যালার্জির প্রবণতা থাকলে বা নিয়মিত ওষুধ খেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই ব্যবহার করা ভালো। ক্যামোমাইল তাই বলা যায়। একটি ফুল নয়, বরং প্রাকৃতিক নিরাময়ের এক কোমল স্পর্শ।
মৌরি বীজ
মৌরি বীজ রান্নাঘরের একটি সাধারণ উপাদান হলেও, এর ভেষজ গুণাগুণ একে প্রাকৃতিক ওষুধের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। ছোট ছোট এই সুগন্ধি বীজ কেবল খাবারের স্বাদই বাড়ায় না, বরং হজমের সমস্যার মতো সাধারণ অসুবিধার দ্রুত ও সহজ সমাধান দেয়। বিশেষ করে ভারী খাবারের পর এক চিমটি মৌরি চিবিয়ে খেলে তা পেটের অস্বস্তি, গ্যাস ও বদহজম অনেকটাই দূর করে দেয়। মৌরি বীজে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টিস্পাসমোডিক উপাদান পেটের পেশি শিথিল করে এবং হজম শক্তি বাড়ায়।
গরম পানিতে ভেজানো মৌরি বা মৌরি চাও একইভাবে আরাম দেয় ও শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখে। শুধু হজমেই নয়, মৌরি বীজ মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে, ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বাড়াতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। তবে মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত ব্যবহার করলে এটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে হরমোন-সংবেদনশীল অবস্থায়। তাই পরিমিত ও সচেতন ব্যবহারই মৌরি বীজের প্রকৃত উপকার পাওয়ার চাবিকাঠি। এটি বলা যায়। একটি ছোট বীজে লুকিয়ে আছে সুস্থ জীবনের বড় সমাধান।
প্রোবায়োটিক
এক ধরনের উপকারী জীবাণু, যা আমাদের শরীর বিশেষ করে অন্ত্রের পরিবেশ সুস্থ ও সঠিকভাবে কার্যকর রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরা মূলত “ভালো ব্যাকটেরিয়া” হিসেবে পরিচিত, যারা অন্ত্রে বাস করে এবং হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করার পাশাপাশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়ায়। দই, ছানা, আচার, কিমচি, কেফির, মিসো কিংবা গাঁজনকৃত খাবারে এই প্রোবায়োটিক স্বাভাবিকভাবেই উপস্থিত থাকে। এছাড়া প্রোবায়োটিক সাপ্লিমেন্ট হিসেবেও পাওয়া যায়, যা বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর অন্ত্রে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি রোধে সহায়ক।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত প্রোবায়োটিক গ্রহণ করলে বদহজম, ডায়রিয়া, অ্যাসিডিটি এবং আইবিএস (Irritable Bowel Syndrome)-এর মতো সমস্যা হ্রাস পেতে পারে। তবে এগুলোর কার্যকারিতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে, তাই কারো দীর্ঘমেয়াদি পেটের সমস্যা থাকলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রোবায়োটিক গ্রহণ করাই সর্বোত্তম। বলা যায়, এই ক্ষুদ্র জীবাণুগুলো আমাদের বৃহত্তর স্বাস্থ্য রক্ষায় এক নিরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ যোদ্ধা।
আপেল সিডার ভিনেগার
আপেল সিডার ভিনেগার (Apple Cider Vinegar) হলো এক অনন্য প্রাকৃতিক উপাদান, যা টক স্বাদের হলেও শরীরের জন্য অনেক দিক থেকে মিষ্টি ফল বয়ে আনে। আপেল গাঁজনের মাধ্যমে তৈরি এই তরলটি হজমতন্ত্রের কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে দারুণ কার্যকর। বিশেষ করে খাবারের আগে এক গ্লাস পানিতে সামান্য আপেল সিডার ভিনেগার মিশিয়ে পান করলে বদহজম, গ্যাস ও অম্লতা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শুধু হজমই নয়, রক্তে শর্করার ভারসাম্য রক্ষা, ওজন নিয়ন্ত্রণ, এমনকি ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এর ব্যবহার আশ্চর্যজনকভাবে কার্যকর।
ব্রণ বা খুশকির মতো সমস্যায় এটি প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে যেহেতু এটি একটি অম্লীয় দ্রব্য, তাই অতিরিক্ত বা অপরিমিত ব্যবহারে দাঁতের এনামেল ক্ষয়, গলা জ্বালাপোড়া বা পাকস্থলীর সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই নিরাপদ ব্যবহারের জন্য সর্বদা পানি মিশিয়ে সেবন করা এবং দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। স্বাস্থ্য ও রূপচর্চায় যে সামান্য পরিবর্তন অসাধ্যকে সম্ভব করতে পারে। আপেল সিডার ভিনেগার তারই একটি চমৎকার উদাহরণ।
হজমশক্তি বাড়াতে এক কাপ আদা চা পান করুন
আদা শুধু রান্নার উপাদান নয়। এটি একটি প্রাকৃতিক ওষুধ, বিশেষ করে হজমজনিত সমস্যার জন্য। এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি উপাদান হজমের সমস্যা। যেমনঃ গ্যাস, এসিড রিফ্লাক্স বা পেটে জ্বালাপোড়া সহজেই কমাতে পারে। এক কাপ উষ্ণ আদা চা যেন পেটের জন্য আরামদায়ক এক ম্যাজিক পানীয়। শুধু তাই নয়, আদা বমি ভাব দূর করে, প্রদাহ হ্রাস করে এবং পেশির ব্যথা কমাতেও সহায়ক। আপনি চাইলে প্রতিদিনের রুটিনে বিভিন্নভাবে আদা যোগ করতে পারেন।
যেমনঃ আদা জল বানিয়ে সকালে খালি পেটে পান করা, মুখে আদা মিছরি রাখা, কিংবা ঠান্ডা পানীয় হিসেবে আদা জলে উপভোগ করা। আদার এই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো আপনাকে দেবে সুস্থ ও সতেজ অনুভূতি, একেবারে ভেষজ পদ্ধতিতে।
মৌরি বীজ দিয়ে আপনার গ্যাস্ট্রিক সিস্টেমকে শিথিল করুন
বদহজমের ঘরোয়া ও কার্যকর সমাধান খুঁজলে মৌরির বীজ নিঃসন্দেহে প্রথম সারিতে থাকবে। এই ছোট ছোট বীজে থাকা প্রাকৃতিক তেল অন্ত্রের মধ্যে অতিরিক্ত গ্যাসের চাপ কমাতে দারুণ কাজ করে। ফলে পেটের ফাঁপাভাব ও অস্বস্তি দ্রুত হ্রাস পায়। মৌরি শুধু অ্যান্টিব্যাকটেরিয়ালই নয়। এটি হজম রস নিঃসরণ বাড়িয়ে পেটের খাবার সহজে ভাঙতেও সাহায্য করে। আপনি খাবার পর কিছু মৌরি চিবিয়ে খেতে পারেন। যা মুখে সতেজতাও আনে, আবার হজমও উন্নত করে।
আবার চাইলে গরম পানিতে কিছু মৌরি ভিজিয়ে রেখে তৈরি করতে পারেন এক কাপ মৌরি চা, যা শুধু পেটের আরামই নয়, বরং প্রতিদিনের হজমশক্তি বাড়াতে এক প্রাকৃতিক পথ্য হিসেবেই কাজ করে।
মুলেথি সেবন করে
আজওয়াইন সেবন করুন
পেট ফাঁপা, অ্যাসিডিটি কিংবা বদহজম এই সব সমস্যা দূর করতে প্রাকৃতিকভাবে কার্যকর এক উপাদান হলো জিরা। এতে থাকা সক্রিয় এনজাইম হজমের গতি বাড়ায় এবং অন্ত্রে জমে থাকা গ্যাস সহজেই বের করে দেয়। হঠাৎ পেটে ব্যথা বা অস্বস্তি শুরু হলে, এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ জিরা সিদ্ধ করে তা অর্ধেক পরিমাণে নামিয়ে নিয়ে ছেঁকে পান করলেই মিলবে তাত্ক্ষণিক স্বস্তি। শুধু তা-ই নয়, শুকনো জিরা ভেজে গুঁড়ো করে রাখা গেলে।
খাবারের পর অল্প পরিমাণে সেই গুঁড়ো সেবন করলেও হজম শক্তিশালী হয়। এই সরল কিন্তু শক্তিশালী ঘরোয়া উপায়টি প্রতিদিনের ডায়েটে রাখতে পারলে হজমজনিত সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
আমলা দিয়ে বদহজমের সমস্যা নিরাময়
আমলা ছোট হলেও কার্যকারিতায় অসাধারণ এক ভেষজ রত্ন। এতে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টি ইনফ্ল্যামেটরি ও অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল গুণ বদহজম, অ্যাসিডিটি ও বুকজ্বালার মতো সমস্যায় দ্রুত আরাম এনে দেয়। এটি শুধু হজমশক্তি বাড়ায় না, বরং অন্ত্র পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে, যার ফলে পেট থাকে হালকা ও আরামদায়ক। আমলার ল্যাক্সেটিভ, ডিউরেটিক এবং কার্মিনেটিভ গুণ একে পরিপূর্ণ হজম সহায়ক করে তোলে।
আপনি চাইলে কাঁচা আমলা চিবিয়ে খেতে পারেন। শুকনো ক্যান্ডি রূপে সংরক্ষণ করে স্ন্যাকসের মতো খেতে পারেন। অথবা একটুকরো আমলা বাটারমিল্কে ভিজিয়ে নিয়ে খেলে তা হজমের জন্য হয় দারুণ এক প্রাকৃতিক টনিক। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে আমলা যুক্ত করলে শরীর যেমন সুস্থ থাকে, তেমনি হজম ব্যবস্থাও হয় আরও শক্তিশালী।
হিং এর সাহায্যে পেটের অসুখ থেকে মুক্তি পান
পেটের যেকোনো অস্বস্তির দ্রুত সমাধানে এই ভেষজ উপাদানটি হতে পারে আপনার নির্ভরতার নাম। এতে থাকা প্রাকৃতিক ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে সক্রিয় করে তোলে এবং অন্ত্রের গতিশীলতা উন্নত করে, যার ফলে পেট ফাঁপা, গ্যাস্ট্রাইটিস, ফোলাভাব ও ব্যথা সহজেই নিয়ন্ত্রণে আসে। এর অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য অন্ত্রের ক্ষতিকর জীবাণুর বৃদ্ধি রোধ করে, ফলে সংক্রমণ বা ইনফেকশন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় দ্রুত। শুধু হজমশক্তিই নয়।
এটি আপনার সামগ্রিক মেটাবলিজম বা বিপাকক্রিয়াও উন্নত করে, ফলে শরীর থাকে হালকা ও সক্রিয়। আপনি চাইলে এটি পাউডার, চা বা খাদ্যযোগে নিয়মিত গ্রহণ করতে পারেন। একটি ছোট অভ্যাস যা আপনার পেটের সুস্থতায় এনে দিতে পারে বড় পরিবর্তন।
বদহজমের কারণ
বদহজম কোনো একক সমস্যার নাম নয়। বরং এটি বিভিন্ন কারণের সমন্বয়ে ঘটে যাওয়া একটি অস্বস্তিকর শারীরিক অবস্থা। অতিরিক্ত খাওয়া, খুব দ্রুত খাবার গেলা, চর্বি ও মসলা ভর্তি খাবার গ্রহণ কিংবা মানসিক চাপ, সবকিছুই বদহজমের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। এমনকি কিছু ওষুধ যেমন অ্যান্টিবায়োটিক, আয়রন সাপ্লিমেন্ট কিংবা অতিরিক্ত অ্যান্টাসিডও হজমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অনেক সময় এই উপসর্গগুলো আরও জটিল রোগের পূর্বসংকেত হতে পারে।
যেমনঃ GERD, গ্যাস্ট্রিক আলসার বা পিত্তথলির পাথর। তাই বদহজমকে হালকাভাবে না নিয়ে, সচেতন হওয়াই ভালো। ঘরোয়া পর্যায়ে কিছু সহজ পরিবর্তন। যেমনঃ ধীরে খাওয়া, অতিরিক্ত তেল মসলাযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা এবং ছোট ছোট ভাগে খাবার গ্রহণ বদহজমের লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
কিছু সাধারণ কারণগুলির মধ্যে নিম্নলিখিতগুলি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বদহজমের পেছনে যে কারণগুলো কাজ করে। সেগুলোর বেশিরভাগই আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাসের সঙ্গে জড়িত। অতিরিক্ত খাওয়া। দ্রুত খাওয়ার অভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত বা মসলাযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান ও মদ্যপানের মতো অভ্যাস বদহজমকে সহজেই ডেকে আনে। এমনকি মানসিক চাপও হজম প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তবে এসবের সমাধানে ঘরে বসেই কিছু সহজ উপায় অবলম্বন করা যায়।
যেমনঃ ওভার দ্য কাউন্টার অ্যান্টাসিড সেবন, ভেষজ উপাদান দিয়ে তৈরি ঘরোয়া প্রতিকার, এবং পেটের ব্যথা বা বমি ভাব কমাতে সহায়ক কিছু নিরাপদ ওষুধ। তবে যদি বদহজমের সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হয়ে পড়ে এবং সাধারণ চিকিৎসায় উপশম না মেলে, তাহলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ এর পেছনে থাকতে পারে আরও জটিল স্বাস্থ্যসমস্যা।
বদহজম প্রতিরোধের টিপস
বদহজম প্রতিরোধে কোনো জাদু প্রয়োজন হয় না। শুধু দরকার কিছু সচেতন জীবনযাপন অভ্যাস। দিনের খাবারকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে খেলে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং পাকস্থলীর উপর চাপ কম পড়ে। রাতের দেরিতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করলে অ্যাসিড রিফ্লাক্স ও বুকজ্বালার ঝুঁকিও কমে যায়। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত, ভাজা ও মসলা-ভর্তি খাবার খাওয়ার প্রবণতা কমাতে হবে, আর পর্যাপ্ত পানি পান ও প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় ব্যায়ামে লিপ্ত থাকাও হজমশক্তিকে দৃঢ় করে।
মানসিক চাপও বদহজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রিগার। তাই নিজেকে কিছুটা সময় দিন, শিথিল হোন, মন শান্ত রাখুন। যদি ঘরোয়া উপায় যথেষ্ট না হয়, তাহলে ওভার-দ্য-কাউন্টার অ্যান্টাসিড বা H2 ব্লকার সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র উপসর্গ দেখা দিলে, নিজে ওষুধ না খেয়ে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই হবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিও অনেক সময় কার্যকর হতে পারে, বিশেষ করে যারা প্রাকৃতিক উপায়ে উপশম চান। মনে রাখবেন, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই বদহজম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পন্থা।