মৃত্যুর মুহূর্তে করণীয় কী? ইসলামিক নির্দেশনা

মৃত্যুর মুহূর্তে করণীয় কী? ইসলামিক নির্দেশনা কি? আপনি কি জানেন? মৃত্যুর মুহূর্তে করণীয় কী? ইসলামিক নির্দেশনা অনুসারে প্রত্যেক মুসলমানের জানা দরকার। মৃত্যু এক অমোঘ সত্য, যা থেকে কারোই রেহাই নেই। ইতিহাসের রাজা বাদশা, দরবেশ অলিয়া কেউই এই বাস্তবতা এড়াতে পারেনি। তাই একজন মুমিনের উচিত, মৃত্যুকে ভয় নয়। বরং সচেতনতার সাথে প্রস্তুতি নেওয়া।

মৃত্যুর সময় একজন মৃতব্যক্তির পাশে যারা উপস্থিত থাকবেন। তাদের জন্য রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। যেমন: মৃতের চোখ দু’টি বন্ধ করে দেওয়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নরম থাকা অবস্থায় সোজা করে দেওয়া, পেটের উপর ভারী কিছু রাখা যেন তা ফুলে না যায়। আজকের আর্টিকেল এ জানবো মৃত্যুর মুহূর্তে করণীয় কী? ইসলামিক নির্দেশনা সম্পর্কে।

মৃত্যুর মুহূর্তে করণীয় কী? ইসলামিক নির্দেশনা

নিঃসন্দেহে, মানুষের জীবনে সবচেয়ে অবধারিত এবং নিশ্চিত সত্য হলো মৃত্যু। পৃথিবীর কোনো মানুষই এই অনিবার্য পরিণতির হাত থেকে রেহাই পাবে না। সে যত বড় ক্ষমতাধর হোক না কেন। ধনী গরিব, শাসক প্রজাসহ প্রত্যেকেই একদিন বিদায় নেবে এ জগৎ থেকে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেনঃ “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৮৫)। এ বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আমাদের উচিত মৃত্যুকে একটি প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখা।

বিশেষ করে, যখন কারো মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসে, তখন তার আশপাশের মানুষদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও করণীয় নির্ধারিত রয়েছে ইসলামে। এ সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের করণীয় হলো এই যে মৃত্যুপথযাত্রীকে কিবলামুখী করে শুয়ানো, ধীরে ধীরে কালিমা পাঠ করানো, তার জন্য দোয়া করা, মৃত্যুর পর দ্রুত গোসল, কাফন ও জানাজার ব্যবস্থা করা এবং মর্যাদার সঙ্গে দাফনের ব্যবস্থা করা। এসব কাজ শুধু মৃত ব্যক্তির প্রতি দায়িত্ব পালনই নয়, বরং জীবিতদের জন্যও এক তাগিদ করে মৃত্যুর কথা স্মরণ করে নিজ জীবনের হিসাব গুছিয়ে নেওয়ার আহ্বান।

একটি কাপড়ে পুরো শরীর ঢেকে রাখা এবং সম্ভব হলে মৃত্যুর স্থানেই দাফন সম্পন্ন করা। এসব কাজ শুধু ইসলামি নির্দেশনা নয়, বরং মৃত ব্যক্তির প্রতি জীবিতদের সম্মান ও দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। আল্লাহ তাআলা কোরআনে বলেন, “প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)। তাই আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত, হে আল্লাহ! মৃত্যুর আগেই তুমি আমাদের কবরের প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান কর।

১. ❝তালকিন❞ বা কালেমা স্মরণ করানো

মৃত্যুশয্যায় থাকা ব্যক্তি যদি এখনো সচেতন থাকেন, তবে তার পাশে থাকা মানুষদের গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব হলো তাকে ধীরে ও মমতার সাথে তাওহিদের কালিমা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”। এই পবিত্র বাক্য যেন তার শেষ কথা হয়, এটাই একজন মুমিনের সৌভাগ্যের চূড়ান্ত নিদর্শন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমাদের মরণের সময়কার ব্যক্তিদের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলতে বলো।” (মুসলিম, হাদিসঃ ৯১৬)।

তবে এতে জবরদস্তি নয়, বরং কোমল কণ্ঠে, ধৈর্যের সাথে ও আন্তরিকভাবে তাকে স্মরণ করানোই সুন্নতের উত্তম আদব। কারণ এই কালিমা হলো জান্নাতের চাবি, আর মৃত্যুর মুহূর্তে তা হৃদয় থেকে উচ্চারিত হলে, তা হতে পারে মুক্তির সোনালি সোপান।

২. চোখ বন্ধ করে দেওয়া

কারো মৃত্যু হলে প্রথম যে কাজটি সুন্নত হিসেবে করার কথা বলা হয়েছে, তা হলো তার চোখ দুটো বন্ধ করে দেওয়া। কারণ, হাদিসে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "যখন রূহ বের হয়ে যায়, তখন দৃষ্টিও তা অনুসরণ করে" (মুসলিম)। এই নির্দেশনার বাস্তব উদাহরণ দেখা যায়, যখন হজরত আবু সালামা (রাঃ) ইন্তেকাল করেন, রাসুল (সা.) নিজ হাতে তাঁর চোখ বন্ধ করে দেন। এতে বোঝা যায়।

মৃত্যুর পর মৃতব্যক্তির দৃষ্টিকে প্রশান্ত ও শালীনভাবে বিদায় দেওয়ার জন্য চোখ বন্ধ করে দেওয়া শুধু একটি শারীরিক প্রক্রিয়া নয়। বরং তা এক প্রকার সম্মান ও মর্যাদার প্রকাশ, যা ইসলামের সংবেদনশীলতা ও সৌন্দর্যের অংশ।

৩. অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সোজা করে দেওয়া

মৃত্যুর পর অল্প সময়ের মধ্যেই দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শক্ত হয়ে যেতে শুরু করে, যা পরে কাফন ও দাফনের কাজে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শরিয়তের আদব হলো মৃতদেহ কড়া হয়ে যাওয়ার আগেই তার হাত পা ও শরীরের অন্যান্য অঙ্গ সোজা করে দেওয়া। এটি একদিকে যেমন মৃতের প্রতি যত্ন ও মর্যাদার পরিচায়ক, অন্যদিকে দাফনের প্রক্রিয়াও এতে সহজ ও সম্মানজনকভাবে সম্পন্ন হয়। এ ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ Sunnah আমল, একজন মুসলিমের জান্নাতের পথে যাত্রাকে সহজতর করতে সহায়ক হতে পারে।

৪. শরীর ঢেকে রাখা

মৃত্যুর পর শরীর নিস্তেজ হলেও, ইসলামে মৃতের মর্যাদা ও গোপনীয়তা বজায় রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এজন্য সুন্নত হলো মৃত ব্যক্তিকে সঙ্গে সঙ্গে একটি পরিষ্কার, বড় কাপড়ে ঢেকে দেওয়া। এটি শুধু শারীরিকভাবে আচ্ছাদনের উদ্দেশ্যে নয়, বরং এতে নিহিত রয়েছে মানবিকতা, সম্মান ও শালীনতার গভীর শিক্ষা। একজন মুসলিমের জীবন যেমন পবিত্রতা ও পর্দার মধ্যে আবৃত থাকে, তেমনই মৃত্যুর পরও তার শরীর ঢেকে দেওয়ার মাধ্যমে সেই মর্যাদার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়।

৫. পেটের ওপর ভারী কিছু রাখা

মৃত্যুর পর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়লেও কিছু প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে, যার ফলে অনেক সময় পেট ফুলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই পরিস্থিতি এড়াতে ইসলামী আদব অনুযায়ী, মৃতব্যক্তির পেটের উপর হালকাভাবে ভারী কিছু রাখা হয়। যেমন ভাঁজ করা একটি কাপড় বা কাপড়ের পুঁটলি। এটি শরীরের আকৃতি ঠিক রাখতে সহায়তা করে এবং দাফনের পূর্ব পর্যন্ত মর্যাদা বজায় রাখে। এমন ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এই কাজগুলোই ইসলামি দাফন প্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম সৌন্দর্য ও শালীনতার প্রতিফলন।

৬. দ্রুত দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া

ইসলামের দৃষ্টিতে মৃত্যুর পর মৃতদেহকে বেশি সময় ফেলে রাখা অনুচিত। বরং শরিয়তের নির্দেশনা হলো মৃত্যুর পর যত দ্রুত সম্ভব গোসল, কাফন ও দাফনের ব্যবস্থা সম্পন্ন করা। এতে মৃতের প্রতি সম্মান রক্ষা হয় এবং দাফনের দীর্ঘসূত্রিতা থেকে জন্ম নেওয়া অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা এড়ানো যায়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্টভাবে বলেছেন, "তোমরা মৃতকে দ্রুত দাফন করো।" (বুখারি ও মুসলিম)। এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মৃত্যুর পর দাফন বিলম্ব না করে যথাসময়ে ইসলামি পদ্ধতিতে তা সম্পন্ন করাই হচ্ছে একজন মুমিনের প্রতি প্রকৃত দায়িত্ব পালন।

৭. জানাজার নামাজ ও দোয়া

একজন মুসলমানের ইন্তেকালের পর তার প্রতি জীবিতদের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো জানাজার নামাজ আদায় করা। এটি শুধু একটি ইবাদত নয়, বরং মৃত ব্যক্তির প্রতি উম্মাহর সম্মান, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রকাশ। জানাজার মাধ্যমে মুসলিম সমাজ একত্র হয়ে মৃতের জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করে। এই দোয়া এবং নামাজ তার কবর জীবনের সফরকে হালকা করতে পারে। তাই এটি কোনো ঐচ্ছিক আনুষ্ঠানিকতা নয়।

বরং একটি সম্মানিত ফরজে কিফায়া, যা পালিত না হলে গোটা সমাজ দায়ী হয়। প্রতিটি ঈমানদার মুসলমানের উচিত, এই ইবাদতে অংশগ্রহণ করে মৃত ভাই বা বোনের আখিরাতের পথ সহজ করে দেওয়ার চেষ্টা করা।

শেষ কথা

মৃত্যুর শেষ মুহূর্তটি জীবনের সবচেয়ে গম্ভীর ও মহামূল্য সময়। এ সময় একজন মুমিনকে শুধু বিদায় নয়, বরং অনন্ত জীবনের পথে যাত্রার প্রস্তুতি নিয়ে বিদায় দিতে হয়। তাই মৃতব্যক্তির আশপাশের মানুষের দায়িত্ব হয় আরও সংবেদনশীল ও সুনির্দিষ্ট। তাদের উচিত, বিদায় নিতে যাওয়া মানুষটির জন্য এমন পরিবেশ তৈরি করা। যেখানে আল্লাহর স্মরণ, হৃদয়ের প্রশান্তি এবং ইসলামের আদর্শ প্রকাশ পায়। এই বিদায় যেন হয় ভালোবাসা, সম্মান এবং সুন্নতের আলোকে মোড়ানো এক আখিরাতের যাত্রা।

মৃত্যু অবধারিত হলেও, একজন মুমিনের শেষ মুহূর্তকে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। তিনি যেন আমাদের সকলকে ঈমানের আলো নিয়ে মৃত্যুবরণ করার সৌভাগ্য দান করেন। আমিন।

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন